চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সফর

মাতারবাড়ী থেকে মিরসরাই পর্যন্ত শিল্পায়ন পরিকল্পনার কথা জানালেন প্রধানমন্ত্রী

কক্সবাজারের মাতারবাড়ী থেকে চট্টগ্রামের মিরসরাই পর্যন্ত দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

তিনি বলেছেন, ‘দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা না থাকলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীরা কারখানা স্থাপনের পর কাঁচামাল দেশে আনা এবং উৎপাদিত পণ্য বন্দর দিয়ে নির্বিঘ্নে পরিবহন করতে চান। এজন্য রাস্তাঘাটসহ দেশের সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে হবে।’

গতকাল চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বাহারছড়া এলাকায় সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে আয়োজিত গৃহ হস্তান্তর, অনুদান ও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে তিনি কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন। সেখানে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি প্রস্তাবিত সৌরবিদ্যুৎ, এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মেট্রোকেমিক্যাল, রিফাইনারি, এলপিজি জেটি ও ভবিষ্যৎ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থানও পরিদর্শন করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী সকালে ঢাকা থেকে মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পৌঁছেন। সেখানে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আল্ট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিচালন কার্যক্রম, উৎপাদন সক্ষমতা, জ্বালানি সরবরাহ ও ব্যবস্থাপনা, পরিচালন দক্ষতা, রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তার সামনে তুলে ধরা হয়।

পরে প্রস্তাবিত ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থান, একই এলাকায় প্রস্তাবিত এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পেট্রোকেমিক্যাল প্রকল্প ও নতুন রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত স্থান সরজমিনে দেখেন। এছাড়া প্রস্তাবিত অস্থায়ী এলপিজি জেটি এবং ভবিষ্যতে ৩ ও ৪ নম্বর কোল পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের জন্য নির্ধারিত স্থানের পাশাপাশি মাতারবাড়ীর কয়লা জেটি, গভীর সমুদ্রবন্দর, এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিভিন্ন অবকাঠামো পর্যবেক্ষণ করেন।

বাঁশখালীর অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘চট্টগ্রাম অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ অঞ্চলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেখানে শত শত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠবে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রামের বিপুলসংখ্যক বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।’

বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাতারবাড়ী যাওয়ার সময় মিরসরাই ও মহেশখালী অঞ্চল দেখেছি। বিশাল এ সমুদ্রসম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।’

মাতারবাড়ীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, জ্বালানি অবকাঠামো ও সম্ভাব্য শিল্প প্রকল্পগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগানোর মাধ্যমে উপকূলীয় এ অঞ্চলকে শিল্পায়নের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথাও তার বক্তব্যে উঠে আসে। মিরসরাই থেকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে এ অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘দেশের মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হলে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করে কারখানা স্থাপন করতে হবে। এর পূর্বশর্ত দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা থাকা। বিশৃঙ্খলা থাকলে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা যখন বিনিয়োগ করবেন, তখন তারা চাইবেন তাদের কারখানায় উৎপাদিত পণ্য যথাযথভাবে বন্দর দিয়ে দেশের বাইরে যেতে পারবে এবং প্রয়োজনীয় কাঁচামালও সঠিকভাবে দেশে আসতে পারবে। রাস্তাঘাটে শান্তি না থাকলে এ কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির স্বার্থে সবাইকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘কিছুদিন ধরে কিছু মানুষ বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তারা কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ না পায়। আমাদের সচেতন হতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে। বিভ্রান্তকারীরা বিভ্রান্তি ছড়িয়ে নিজেদের মতো চলে যাবে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের জনগণ। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশকে এগিয়ে নেয়া হবে, নাকি ঝগড়া-ফ্যাসাদ ও বিভ্রান্তির মধ্যে থাকা হবে।’

অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিগত স্বৈরাচার আমলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত হাতে গোনা কিছু ব্যক্তির হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। জনগণের স্বার্থে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ ব্যবস্থা পুনর্গঠনে কিছুটা সময় প্রয়োজন। সরকার এরই মধ্যে সে কাজ শুরু করেছে। আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কেমন হবে, সে বিষয়ে একটি প্রস্তাব জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এমন পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে যাতে স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, মিল-কারখানা ও বাসাবাড়িতে মানুষ যথাযথভাবে বিদ্যুৎ পায়। একইভাবে গাড়ি-মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ যেন সহজে গ্যাস-জ্বালানি পেতে পারে, সে ব্যবস্থাও করা হবে।

ফ্যামিলি কার্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জনগণের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের প্রায় ৪১ লাখ পরিবারের নারীর হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেয়া হবে। নির্বাচনের পর এক মাসের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এরই মধ্যে পাইলট প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। ১৬ আগস্ট মূল কার্যক্রম শুরু হবে। নারীকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা এবং একটি স্বাবলম্বী পরিবার গড়ে তোলা, সন্তানদের পড়াশোনা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাসহ পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে মায়েদের সক্ষমতা বাড়ানোই এর লক্ষ্য। ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি কৃষক কার্ড চালু করা হচ্ছে। সাধারণ কৃষকের পাশাপাশি লবণচাষীরাও এ সুবিধা পাবেন।’ লবণচাষীদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে শিগগিরই লবণের নতুন মূল্য নির্ধারণের ঘোষণা দেয়া হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

উপজেলা স্বাস্থ্য খাত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা বাড়াতে দেশের ৫০৩টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পাঁচ বছরের মধ্যে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো প্রথমে ৩০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছিল। পরে তা ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। এখন এসব হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে, যাতে গ্রামের মানুষ উপজেলা পর্যায়েই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা পায়।’

মাতারবাড়ী পরিদর্শন শেষে বেলা ১টা ৫ মিনিটে বাঁশখালীর উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। বেলা ১টা ৩৮ মিনিটে বাহারছড়া সমুদ্রসৈকতে নির্মিত হেলিপ্যাডে হেলিকপ্টার অবতরণ করে। সেখান থেকে গাড়িতে করে বাহারছড়া ইউনিয়নে যান তিনি।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য নতুন বাসগৃহ নির্মাণ কর্মসূচির আওতায় একটি পরিবারের কাছে নতুন বাড়ির চাবি হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী। বাড়ির আঙিনায় একটি মেহগনি গাছের চারাও রোপণ করেন তিনি। পাশাপাশি পরিবারটিকে চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও হাঁস-মুরগি দেয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বাঁশখালীতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০০টি অসচ্ছল পরিবারের মধ্যে নতুন ঘরের চাবি হস্তান্তর করা হয়। প্রতিটি ঘরে দুটি কক্ষ ও একটি সংযুক্ত শৌচাগার রয়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিবেচনায় ঘর নির্মাণে আরসিসি পিলার, কাঠ ও টিন ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ১৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও শিশুকে আর্থিক সহায়তার চেক এবং আরো ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘দেশের উৎপাদন বাড়াতে হবে। শিল্প-কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। প্রত্যেক মানুষ যাতে নিজের হাতে নিজের ও পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পারে, সে সুযোগ তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য।’

চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে অর্থ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে অঞ্চলের দুজন ব্যক্তি সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, সে এলাকার উন্নয়ন কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।’

বাঁশখালী থেকে বেলা ৩টার দিকে ফটিকছড়ি উপজেলার উদ্দেশে রওনা হন প্রধানমন্ত্রী। পরে বাবুনগর মাদরাসায় পৌঁছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও কুশল বিনিময় করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন হেফাজত আমির।

রাতে হাটহাজারী সরকারি কলেজ মাঠে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন সময় দেশ গড়ার, এখন সময় জাতির ভাগ্য গঠনের। কাজেই আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে শ্রমিকের হাতে রূপান্তর করতে হবে। আমাদের দেশকে সামনের দিনগুলোয় এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর চট্টগ্রাম সফরের কর্মসূচিতে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চট্টগ্রাম শহরের র‍্যাডিসন ব্লু হোটেলের বিএনপির সাংগঠনিক সভায় অংশগ্রহণ করেন। সভায় চট্টগ্রাম মহানগরী, উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম বিএনপির প্রায় ৬০০ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

আরও